প্রিন্ট এর তারিখ : ৩১ জুলাই ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ৩১ জুলাই ২০২৬
||
ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত ছোট ভাইকে রেডিয়েশন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন দুই চিকিৎসক ভাই। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, সময়মতো ফিডিং ও খিঁচুনি প্রতিরোধক ওষুধ দেওয়া হয়নি, রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা না করেই এমআরআই উইথ কনট্রাস্ট করানো হয়েছে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রসহ আট বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা করে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সবশেষে ২২ জুলাই সকাল ৯টায় আইসিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হলেও বিকেল ২টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত রোগীকে কেবিনেই রাখা হয়। অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাওয়ার পরও প্রায় ৩০ মিনিট চিকিৎসক না আসায় কেবিনেই রোগীর মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।চট্টগ্রামের বেসরকারি এভারকেয়ার হাসপাতালের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ তুলেছেন মৃত রোগী সুবিমল দাশ সুবীরের পরিবার। হাসপাতালটি অক্সিজেন-কুয়াইশ রোডের অনন্যা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ডা. আবীর দাশ তার ভাইয়ের চিকিৎসার শুরু থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। ৩৫ বছর বয়সী সুবিমল ‘থ্যালামিক গ্লাইওমা’ বা মস্তিষ্কের গভীরে হওয়া এক ধরনের ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত ছিলেন। চার বছর আগে বিয়ে করা সুবিমল দেড় বছর বয়সী এক সন্তান রেখে গেছেন। তার স্ত্রী বর্তমানে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা।পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ২০ জুলাই রেডিয়েশন থেরাপির জন্য সুবিমলকে এভারকেয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। দুপুর ২টা ২০ মিনিটে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বিকেল ৩টার দিকে তাকে কেবিনে স্থানান্তর করা হয়। সেখান থেকেই, পরিবারের দাবি, চিকিৎসায় একের পর এক অব্যবস্থাপনা শুরু হয়।ভর্তি থেকেই অব্যবস্থাপনাডা. আবীর দাশ বলেন, কেবিনে নেওয়ার পরপরই দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সকে জানানো হয়, রোগী দুপুর ১২টার পর আর কোনো ফিডিং পাননি। দ্রুত ফিডিংয়ের ব্যবস্থা করার অনুরোধ করা হলেও দীর্ঘ সময় হাসপাতালের প্রশাসনিক কাজ ও কাগজপত্রের প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।তার দাবি, প্রায় ছয় ঘণ্টা পর সন্ধ্যা ৬টায় রোগীকে প্রথম ফিডিং দেওয়া হয়। সেটিও ছিল মাত্র ২০০ মিলিলিটার ডাবের পানি।খিঁচুনির ওষুধ নিয়েও অবহেলাডা. আবীর দাশ জানান, তার ভাই প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা ও রাত ৯টায় নিয়মিত খিঁচুনি প্রতিরোধক ওষুধ গ্রহণ করতেন। কিন্তু সন্ধ্যা ৬টার নির্ধারিত ওষুধ সময়মতো দেওয়া হয়নি।তিনি বলেন, পরিবারের কাছে প্রয়োজনীয় ওষুধ ছিল। তারা বারবার নিজেদের কেনা ওষুধ রোগীকে দেওয়ার অনুরোধ করলেও হাসপাতালের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাইরের ওষুধ দেওয়া যাবে না, হাসপাতালের ফার্মেসির ওষুধই ব্যবহার করতে হবে। তার অভিযোগ, সন্ধ্যা ৬টার গুরুত্বপূর্ণ ডোজ না দিয়ে রাত ৯টার দিকে একসঙ্গে দুই ধরনের খিঁচুনি প্রতিরোধক ওষুধ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই রোগী অতিরিক্ত ঝিমিয়ে পড়েন। এই অবস্থায় হাসপাতালের পক্ষ থেকে বারবার এমআরআই উইথ কনট্রাস্ট করার কথা বলা হলেও তিনি সেদিন তাতে সম্মতি দেননি।এমআরআই ও অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নপরদিন ২১ জুলাই সকালে নিউরোসার্জনসহ চারজন বিশেষজ্ঞ রোগীকে দেখেন। পরে নিউরোসার্জন ও রেডিও-অনকোলজিস্ট এমআরআই উইথ কনট্রাস্ট করার সিদ্ধান্ত দেন।ডা. আবীর দাশ বলেন, তিনি চিকিৎসকদের জানিয়েছিলেন, এর আগে রোগীর তিনটি এমআরআই ও ছয়টি সিটি স্ক্যান করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, বর্তমান শারীরিক অবস্থায় রোগী এমআরআই করার মতো উপযুক্ত কি না। চিকিৎসকেরা তাকে উপযুক্ত বলেই মত দেন।তার ভাষ্য, রোগীর আগে মেনিনজাইটিস থাকলেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগের সাত দিন কোনো জ্বর ছিল না। রোগীর ভাইটালস স্বাভাবিক ছিল। সি-রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন (সিআরপি) আগের ৩৮ থেকে কমে ৬-এ নেমে এসেছিল। যদিও গত এক মাস ধরে রোগীর গ্লাসগো কোমা স্কেল (জিসিএস) কম ছিল।ডা. আবীর দাশ আরও অভিযোগ করেন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের আটজন অধ্যাপক রোগীকে ‘নন-অপারেবল’ বলে মত দিলেও এভারকেয়ার হাসপাতালের নিউরোসার্জন ব্রেইন টিউমার অপসারণের সিদ্ধান্ত দেন।তার দাবি, ২১ জুলাই এমআরআই উইথ কনট্রাস্ট করার পর রাতে রোগীকে কেবিনে ফিরিয়ে আনার পর থেকেই উচ্চমাত্রার জ্বর শুরু হয়। নাপা ইনজেকশন দিয়েও সেই জ্বর কমানো যায়নি।সকাল ৯টার সিদ্ধান্ত, সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পরও আইসিইউ নয়ডা. আবীর দাশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২২ জুলাই সকাল ৯টায় রেডিয়েশন বিভাগের চিকিৎসক ও আইসিইউর চিকিৎসক সুবিমলকে দ্রুত আইসিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। পরিবারের পক্ষ থেকে সঙ্গে সঙ্গে এতে সম্মতি দেওয়া হয়।তিনি বলেন, চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে কোনো ধরনের বিলম্ব না ঘটে, সে জন্য আগেই হাসপাতালের হিসাবে অগ্রিম অর্থ জমা রাখা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, টাকার কারণে চিকিৎসা বা আইসিইউতে স্থানান্তর যেন আটকে না থাকে।তার অভিযোগ, সকাল ৯টায় আইসিইউতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও বিকেল ২টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত রোগীকে কেবিনেই রাখা হয়।স্যাচুরেশন কমার পরও চিকিৎসক আসেননিডা. আবীর দাশ জানান, ২২ জুলাই দুপুর ২টায় রোগীকে ফিডিং দেওয়া হয়। মাত্র ২০ মিনিট পর তার অক্সিজেন স্যাচুরেশন দ্রুত কমে যায়।তিনি বলেন, তখন তার মা টানা প্রায় ৩০ মিনিট চিকিৎসকদের ডাকলেও কেউ কেবিনে আসেননি। চিকিৎসকেরা যখন আসেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। বিকেল ২টা ৩৫ মিনিটে কেবিনেই তার ভাইয়ের মৃত্যু হয়।তিনি আরও অভিযোগ করেন, হাসপাতালে প্রতি দুই ঘণ্টা পর রোগীর অবস্থান পরিবর্তন, টয়লেট পরিষ্কারসহ মৌলিক নার্সিং সেবাও নিয়মিত পাওয়া যায়নি। ফ্লোরে দায়িত্বপ্রাপ্ত আয়া বা সহায়ক কর্মীদের সহজে পাওয়া যেত না বলেও তিনি দাবি করেন।ডা. আবীর দাশ বলেন, চিকিৎসাকালে আরও অনেক অব্যবস্থাপনা হয়েছে, যা লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। তার প্রশ্ন, ‘সকাল ৯টায় আইসিইউতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো, কিন্তু আমার ভাই বিকেল ২টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত কেবিনেই কেন ছিল?’তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দুই ভাইই চিকিৎসক। আমরা যদি এমন অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসায় অবহেলার শিকার হই, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় নিরাপদ চিকিৎসা পাবে? সেবার নামে এখানে বাণিজ্যিক মানসিকতা পরিচালিত হচ্ছে।’ডা. আবীর দাশ বলেন, ‘এটি আসলে একটি সম্মিলিত অব্যবস্থাপনার ফসল। এর প্রতিকারের জন্য কোনো লড়াই করার আগ্রহ আমার নেই। আমি কোথাও কোনো অভিযোগও করতে চাই না। কারণ এখন অনেকেই হয়তো পাশে থাকার কথা বলবেন, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। করপোরেট হাসপাতালের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ করার ইচ্ছেও আমার নেই।’সামাজিক মাধ্যমে চিকিৎসকদের ক্ষোভডা. আবীর দাশের পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পোস্টটির নিচে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মন্তব্য করেছেন কয়েকজন চিকিৎসকও।চিকিৎসক মঈনুল আনাম লিখেছেন, ‘আমার প্রয়াত বাবার যখন খাদ্যনালীর ক্যান্সার হয়েছিল, তখন চট্টগ্রাম এভারকেয়ারে রেডিওথেরাপি দিয়েছিলাম। সেখানকার ব্যবস্থাপনা খুবই বাজে, নামমাত্র ক্যান্সার বিভাগ চলছে এবং তেমন ভালো কোনো কনসালট্যান্টও নেই।’চিকিৎসক শম্পা দত্ত বিশ্বাসও তার মায়ের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দাবি করেন, ‘আমার মায়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল। ২৬ দিনের একটা লড়াই। আমরা, বিশেষ করে আমি, কতটা অসহায় ছিলাম! কারণ একটাই—আমি একজন দুর্ভাগ্যবান ডাক্তার। আইসিইউতে টিউব দিতে (ইনটুবেশন) গিয়ে ফুসফুসে আঘাত পেয়ে বাতাস জমে যায় (ট্রমেটিক নিউমোথোরাক্স)। এরপর ক্যানুলার জায়গায় একটা ফোসকা হয়েছিল, যেটা সাধারণ ড্রেসিং করলেই ঠিক হয়ে যেত। কিন্তু তারা বলল, প্লাস্টিক সার্জারি করতে হবে। মায়ের এত বেশি জ্বর ছিল যে তিনি এই ধকল সহ্যই করতে পারেননি। শকের রোগীকে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছিল, যা তাঁর কিডনি পুরোপুরি অচল করে দেয়। সাধারণ জ্বরের একজন রোগী কীভাবে যে ২৬ দিনের মধ্যে মৃত্যুর দিকে চলে গেলেন! এটা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা ছিল না। অথচ প্রতিদিন ১,২৫,০০০ টাকা বিল আসত। সবকিছু হয়তো ওপরওয়ালার ইচ্ছা। কিন্তু অনিয়ম ও অবহেলার কারণে আমার মা যে কী কষ্টটা পেলেন! এটার হিসাব কারা দেবে? ডাক্তারদের কিছুটা মানবিক হতে হয়। শুধু একটা প্রতিষ্ঠানের অধীনে থেকে মোটা বেতনের চাকরি করলেই হয় না, দিন শেষে ওপরওয়ালার কাছে হিসাব ঠিকই দিতে হবে।’বুশরা সিকদার নামে একজন বলেছেন, ‘আমার হাজবেন্ডের পায়ের অপারেশনের ফলোআপ ড্রেসিংয়ে আমি নিজে বুঝতে পারছিলাম সেকেন্ডারি ইনফেকশন হয়েছে। এভারকেয়ারের সার্জন ফরমান আলি এটা খুব হালকাভাবে ইগনোর করলেন। পায়ের ইনফেকশনে অনেক ভুগছিল আমার হাজব্যান্ড। পরে ইবনে সিনায় ডা. হাসানুজ্জামান স্যারের চিকিৎসায় আল্লাহর রহমতে ঠিক হয়েছে।’পুনম চৌধুরী লিখেছেন, ‘আমার মেয়েকে এই এভারকেয়ার হসপিটালের ভুল চিকিৎসার জন্য পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়েছে।’হাসপাতাল বলছে, বক্তব্য পরে জানাবেঅভিযোগের বিষয়ে এভারকেয়ার হাসপাতাল, চট্টগ্রামের বক্তব্য জানতে হাসপাতালটির ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরে তাদের বক্তব্য জানাবে।