প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ আগস্ট ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ আগস্ট ২০২৬
আখেরী ‘চাহার সোম্বা’ ও মুসলিম উম্মাহর করণীয়
||
নবী-অলির স্মৃতিবিজড়িত দিবসগুলো নিঃসন্দেহে অনুসরণযোগ্য ও চিরস্মরণীয়। ‘গুলজারে শরীয়ত’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, সফর মাসের শেষ বুধবারকে বলা হয় আখেরী ‘সাহার সোম্বা’। এই দিন বিশেষ পদ্ধতিতে গোসল করা, নির্দিষ্ট কিছু দো‘আ লিখে তা পানিতে ভিজিয়ে পান করা ইত্যাদির মধ্যে রয়েছে বিশেষ উপকারিতা। নবীজির স্মৃতিবিজড়িত এই দিবসটি মুসলিম সমাজে অতীব গুরুত্ব সহকারে পালন হয়ে আসছে। প্রাচীনকাল থেকে পারস্য, মধ্য এশিয়া ও উপমহাদেশে নবীজির রোগমুক্তির স্মৃতি চিরস্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে এ দিবস ভাবগম্ভীর পরিবেশে উদযাপিত হয়ে আসছে। কেননা, নবী-অলির স্মৃতিবিজড়িত দিবসে অসীম কল্যাণ নিহিত থাকে।পবিত্র কুরআনেও বিভিন্ন নবী-রাসূলের স্মরণীয় ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে—যেন মানুষ সেগুলো থেকে হিদায়াতের আলো গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এক শ্রেণীর আলেম নামধারী লোক এ দিবসটিকে বিদ‘আত আখ্যা দিয়ে অপপ্রচার চালায়। তাদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইসলামের এই স্মরণীয় ঘটনাগুলো মানুষের অন্তর থেকে মুছে ফেলা।ইহুদী কর্তৃক নবীজিকে যাদু করার প্রেক্ষাপটনবুয়তের প্রথম অধ্যায়ে নবী করীম ﷺ মক্কার কাফেরদের নির্মম নির্যাতন সহ্য করেছেন দীর্ঘ ১৩ বছর। হিজরতের পর মদিনায় গিয়েও তিনি ইহুদি ও মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রের শিকার হন। তারা মক্কার কাফেরদের সঙ্গে যোগসাজশ করে তাঁকে নানা উপায়ে কষ্ট দিয়েছে, এমনকি প্রাণনাশের ষড়যন্ত্রও করেছে।৭ হিজরিতে হুদায়বিয়ার সন্ধির পর মুহাররম মাসে ইহুদিদের একটি দল তাদের যাদুকর লবিদ ইবনে আ‘সাম এর মাধ্যমে রসুলুল্লাহ ﷺ-কে যাদু করায়। সে নবিজির ব্যবহৃত একটি চিরুনি ও চুল সংগ্রহ করে মোমের পুতুল বানিয়ে তাতে ১১টি সুচ বিদ্ধ করে এবং কুফরি মন্ত্র পড়ে ১১টি গিট দিয়ে কূপের ভেতর পাথরের নিচে রেখে দেয়। এর প্রভাবে নবীজির শরীর ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ে।অতঃপর আল্লাহ তাআলা হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করেন সুরা ফালাক ও সুরা নাস সহ। এই দুটি সুরার আয়াত সংখ্যা ১১। আল্লাহর নির্দেশে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাধ্যমে যাদুর সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এরপর প্রতিটি গিটের বিপরীতে একটি করে আয়াত পাঠ করলে যাদুর কার্যকারিতা দূর হয়ে যায়। নবীজি ﷺ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং গোসল করে বলেন—“এখন আমার শরীর হালকা লাগছে, আমি নিজেকে পুরোপুরি সুস্থ মনে করছি।”এই ঘটনাটি ঘটেছিল সফর মাসের শেষ বুধবারে। নবীজির সুস্থতায় সাহাবায়ে কেরামের শোকরিয়ানবীজির আরোগ্যের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সাহাবায়ে কেরাম ও পরিবারবর্গ তাঁর খেদমতে ছুটে আসেন। হযরত ফাতিমাতুজ জাহরা রাদিয়াল্লাহু আনহা, ইমাম হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমা উপস্থিত হন। বহু সাহাবি নবীজির দরবারে ভিড় জমান।তিনি আবেগঘন কণ্ঠে সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বলেন:“আমার ইন্তেকালের পর আমার বিয়োগে তোমাদের অবস্থা কেমন হবে?”এ কথা শুনে সবাই অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। নবীজি ﷺ তাদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেন—“কেউ পৃথিবীতে স্থায়ী নয়। আমাকেও আমার রবের হুকুম মানতে হবে, তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে।”এরপর তিনি মসজিদে নববিতে প্রবেশ করে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইমামতি করার নির্দেশ দেন, যা ছিল খলিফাতুল মুসলিমীন হওয়ার পূর্বাভাস। নবীজির পূর্ণ সুস্থতায় সাহাবায়ে কেরাম আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন এবং কৃতজ্ঞতাস্বরূপ প্রচুর দান-সাদকা করেন।হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু দান করেন ৫,০০০ দিনারহযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু দান করেন ৭,০০০ দিনারহযরত উসমান গনি রাদিয়াল্লাহু আনহু দান করেন ১০,০০০ দিনারহযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু দান করেন ৩,০০০ দিনারহযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু দান করেন ১০০ উটএ থেকেই স্পষ্ট হয়—নবীজির প্রতি তাদের ভালোবাসা ছিল নিখাদ, অতুলনীয় ও প্রাণাধিক প্রিয়।আখেরী ‘সাহার সোম্বা’ সম্পর্কে ফকীহগণের অভিমত“জাওয়াহিরুল কুনয” (খন্ড-৫, পৃঃ ৬১৬) গ্রন্থে উল্লেখ আছে: সফর মাসের শেষ বুধবার সূর্যোদয়ের পূর্বে গোসল করা মুস্তাহাব। সূর্যোদয়ের পর দু’রাকাত নফল নামাযও অত্যন্ত উপকারী আমল।“তাজকিরাতুল আওরাদ”-এ বলা হয়েছে: এ দিনে প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর আয়াতে সালাম পাঠ করে নিজের শরীরে ফুঁক দিলে এবং তা পানিতে লিখে পান করলে আল্লাহ পাক আপদ-বিপদ থেকে হেফাজত করেন।“আনওয়ারুল আউলিয়া”-তে আছে: এ দিনে যে ব্যক্তি দুই রাকাত নফল নামাযে প্রতি রাকাআতে সূরা ফাতিহার সাথে এগার বার সূরা ইখলাস পড়বে অথবা প্রতি রাকাআতে ৩ বার সূরা ইখলাস পাঠ করে সালাম ফিরাবে, এরপর ৮০ বার সূরা আলম নাশরাহ, সূরা নসর, সূরা ত্বীন ও সূরা ইখলাস পাঠ করবে, তারপর ৭০ বার দরূদ শরীফ পাঠ করে নিম্নোক্ত দো‘আ পড়বে—দরূদ শরীফاللهم صل على سيدنا محمد النبي الأمي وعلى آله وأصحابه وسلمদো‘আإن الله يمسك السموات والارض أن تزولا ولئن زالتا إن أمسكهما من أحد من بعده إنه كان حليماغفوراএ দিনের বিশেষ আমলসমূহ১. প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর আয়াতে সালাম পাঠ করে নিজের বুকে ফুঁক দেওয়া এবং কাগজে লিখে পানিতে ভিজিয়ে পান করা। এতে আল্লাহর রহমতে বহু রোগ থেকে মুক্তি লাভ হয়।আয়াতে সালামসমূহبسم الله الرحمن الرحيم١. سلام قولا من رب الرحيم٢. سلام على نوح فى العالمين٣. سلام على إبراهيم٤. سلام على موسى و هارون٥. سلام على إلياسين٦. سلام عليكم طبتم فادخلوها خالدين٧. سلام هى حتى مطلع الفجر২. এ দিনে গোসল শেষে পবিত্র পাত্রে পানি নিয়ে কলা পাতা বা কাগজে দো‘আ ও নকশা লিখে পানিতে ডুবিয়ে মাথায় ঢালবে। এতে কঠিন রোগ থেকেও মুক্তি মেলে। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে এ দিনের ফজীলত থেকে উপকৃত হওয়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।(সংগৃহীত)
কপিরাইট © ২০২৬ চিটাগাং টুডে