প্রিন্ট এর তারিখ : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দুই প্রকল্পে গচ্চা ২৬ কোটি টাকা, ফের বড় প্রকল্পের তোড়জোড়
||
ছোট হিমাগার নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) দুটি প্রকল্প কৃষকবান্ধব ও সাশ্রয়ী না হওয়ায় সরকারের গচ্চা গেছে প্রায় ২৬ কোটি টাকা। অতিসম্প্রতি জমা পড়া ডিএইর ফার্মার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে হিমাগার নিয়ে বড় প্রকল্পের তোড়জোড় শুরু করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাইলট প্রকল্পের সফলতার মাত্রা দেখেই সরকারের বড় প্রকল্পের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। নইলে সরকারের অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি প্রান্তিক কৃষকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মৌসুমে উৎপাদিত ফল ও সবজি সংরক্ষণে সরকার দুটি প্রকল্পে প্রায় ২৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এসব প্রকল্পে ১৮০টি ছোট হিমাগার করার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত করা হয়েছে ১৫০টি। একটি প্রকল্পে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১০০টি হিমাগার তৈরি করা হয়েছে। আরেকটি প্রকল্পে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি করার কথা থাকলেও করা হয়েছে ৫০টি। প্রকল্প দুটির একটি চলতি বছরের জুনে শেষ হয়েছে, অন্যটি আগামী অক্টোবরে শেষ হবে। দুটি প্রকল্পে তৈরি হিমাগারগুলোর ক্ষেত্রেই কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এখন আরও প্রায় দুই হাজার হিমাগার তৈরির প্রকল্প হাতে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী কোল্ডস্টোরেজ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি প্রকল্প’। ২০২৫ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ হয়েছে চলতি বছরের জুনে। এই প্রকল্পের আওতায় ১০০টি ছোট হিমাগার করা হলেও বিদ্যুৎ-সংযোগ না থাকায় ৫০টি এখনো সচল হয়নি। জানা গেছে, সচল হওয়া হিমাগারের সুফলও কৃষকেরা ঠিকমতো পাচ্ছেন না। প্রকল্পটি নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধান এবং প্রভাব মূল্যায়ন করে গত বুধবার ডিএইর মহাপরিচালকের দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এ বিষয়ে গঠিত কমিটি।
প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিমাগারগুলোতে স্বল্প সময়ে ফল ও সবজি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সংরক্ষিত ফসলের গুণগত মান ঠিক থাকছে না। হিমাগারগুলো ব্যয়সাশ্রয়ী না হওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ছেন অনেক কৃষক। ফলে বর্তমান ব্যবহারের মাত্রায় মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। তা ছাড়া সব ধরনের কৃষিপণ্য (সবজি/ফল) কোল্ডস্টোরেজে সংরক্ষণের জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়।
১২ কোটি টাকার প্রকল্পটির সহযোগিতায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ছোট হিমাগার স্থাপন করেছেন উদ্যোক্তা কৃষক কামাল পারভেজ। তিনি বলেন, এই হিমাগারে রাখার পর সবজির গুণগত মান ভালো থাকে না। সবজি কুঁচকে যায়, রং বদলে যায়। একই রকম তথ্য জানিয়েছেন কুমিল্লার চান্দিনার উদ্যোক্তা কৃষক শরীফ হোসেন। গাজীপুর সদর উপজেলার উদ্যোক্তা কৃষক শাহিনুর ইসলাম শাহিন জানান, হিমাগারে কাঁঠাল রাখার পর গুণগত মান ঠিক থাকেনি। পেঁপের রং পরিবর্তন হয়েছে। আলুতে অংকুর গজিয়েছে।
ডিএইর অনুসন্ধান কমিটি প্রকল্পের ২৬টি হিমাগার সরাসরি গিয়ে পরিদর্শন করেছেন। কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অর্থায়নে স্থাপিত ফার্মার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজসমূহ বর্তমান প্রেক্ষাপটে আর সম্প্রসারণ না করে অধিকতর গবেষণা করে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।’
ফার্মার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ কার্যক্রম সরেজমিন অনুসন্ধান ও প্রভাব মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক মো. রওশন আলম। জানতে চাইলে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বাস্তবে যেটা পেয়েছি, সেটাই আমরা প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদনে লিখেছি। সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে কি না, সেটা যাচাই করেছি।’
মূল্যায়ন প্রতিবেদন দেখার পর মিনি হিমাগার নিয়ে বড় প্রকল্পের বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে বলে মন্তব্য করেন রওশন আলম।
প্রথম প্রকল্পের পর ‘জলবায়ু সহনশীল কৃষির জন্য ফার্মার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন প্রকল্প’ নামে আরও একটি প্রকল্প নেয় সরকার। ২০২৫ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া প্রকল্পটি চলতি বছরের অক্টোবরে শেষ হবে। ১৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পের অধীনে ৮০টি মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপনের কথা রয়েছে। এ পর্যন্ত ৫০টির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হিমাগারের স্থান নির্ধারণ ও কৃষক নির্বাচনে অস্বচ্ছতা রয়েছে। এ ছাড়া হিমাগারগুলো থেকে কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত সুফল পাচ্ছেন না। প্রসঙ্গত, প্রতিটি হিমাগারে ১৭ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।
হিমাগারের প্রকল্প দুটির পরিচালক (পিডি) তালহা জুবাইর মাসরুর। সম্প্রতি ডিএইতে প্রকল্প কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। জানতে চাইলে পিডি বলেন, ‘এ হিমাগারে কোন কোন ফসল রাখা যাবে, ‘কুল চেম্বার’ কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা জানতে হবে। যেসব উদ্যোক্তা কৃষক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, তাঁরা ভালো করেছেন।’
মিনি হিমাগারগুলোতে রাখা ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়া অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর বলেন, ‘লোডশেডিং ও কিছু হিমাগারে আদৌ বিদ্যুৎ-সংযোগ না থাকায় সংরক্ষিত ফসল নষ্ট হচ্ছে। কারিগরি আরও কিছু বিষয় রয়েছে, উদ্যোক্তা কৃষকেরা সচেতন না থাকায় অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাচ্ছেন না।’
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘মিনি হিমাগারগুলোর স্থান নির্বাচন সুনির্দিষ্ট ফসলভিত্তিক এলাকায় হলে ভালো হতো। কয়েকটি হিমাগার ঘুরে দেখেছি, ফসল খুব বেশি সময় সংরক্ষণ করা যায় না। তিন মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে পারলে ভালো হতো।’
সরকার আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশে দুই হাজার ছোট হিমাগার তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। গত ১৫ জুন রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ক্ষুদ্র হিমাগারগুলো চালানোর জন্য ২০ জন কৃষকের সমন্বয়ে একটি করে কমিটি গঠন করা হবে। এই হিমাগারগুলো সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চলবে। সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পের পাইলটিং (পরীক্ষামূলক কাজ) এর মধ্যে শেষ হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন মন্ত্রী।
আমিন উর রশিদ জানান, ‘সরকার মনে করে, দুই হাজার ক্ষুদ্র হিমাগার তৈরি হলে দেশের প্রায় ৪০ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন।’
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ছোট দুই প্রকল্প থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে দুই হাজার হিমাগার স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। তবে নতুন প্রকল্পে শুধু হিমাগার হবে না, এতে সমবায়ভিত্তিক স্বল্পকালীন ফসল সংরক্ষণ করা যাবে। কৃষক বাজার যাচাই করে পণ্য বিক্রি করতে পারবেন। এতে ফসলের সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি কমবে। এই হিমাগারের সঙ্গে গ্রেডিং, প্যাকেজিং, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা, সোলার এয়ারফ্লো প্রযুক্তিতে পেঁয়াজ সংরক্ষণ, সোলার ফ্রুট ড্রায়ার এবং ক্ষুদ্র প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধাও যুক্ত করা হতে পারে।
‘সৌরশক্তিনির্ভর মিনি হিমাগার ও ফসল সংগ্রহত্তোর ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ নামে প্রস্তাবিত নতুন বড় প্রকল্পটির ডিপিপিতে (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে ছোট দুটি হিমাগার প্রকল্পের নেতিবাচক খবরের প্রভাবে বড় প্রকল্প আদৌ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা উইংয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রকল্পের নামে অর্থ লোপাটে কিছু মানুষের পকেট ভরবে। কিন্তু প্রান্তিক কৃষকের উপকার হবে না।’
মিনি কোল্ডস্টোরেজ স্থাপন প্রকল্পের পিডি তালহা জুবাইর মাসরুর প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পটির ডিপিপি তৈরি করেছেন। জানতে চাইলে তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে ডিএইর কর্মকর্তারা হিমাগার নিয়ে বড় প্রকল্পের বিষয়ে নেগেটিভ। তবে কৃষিমন্ত্রী মিডিয়ায় বলেছেন, নতুন প্রকল্প নিয়ে তিনি ইতিবাচক। ফলে এ প্রকল্প হবেই।’
এ বিষয়ে কথা বলতে কৃষিসচিব মো. সেলিম খানকে আজকের পত্রিকা থেকে একাধিকবার কল ও মেসেজ দিলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। হিমাগার প্রকল্প নিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত জানতে চাইলে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘পাইলট প্রকল্পের সফলতা দেখেই সরকারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গণমাধ্যমে খবর দেখেছি, ছোট হিমাগারগুলো ভালোভাবে কাজ করছে না। এখন আবার বিপুল অর্থ খরচ করে দুই হাজার হিমাগার করার পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত মনে হয় না।’
কপিরাইট © ২০২৬ চিটাগাং টুডে