রেলের গতি বাড়াতে আসছে ৩০ নতুন ইঞ্জিন
বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনের পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের জায়গায় ৩০টি নতুন ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে ২ হাজার ৭০ কোটি টাকা। তবে পুরো প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা।
বুধবার (৭ অক্টোবর) প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ করা হবে। প্রতিটির আনুমানিক দাম পড়বে ৬৯ কোটি টাকা। কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা কোম্পানি থেকে এসব ইঞ্জিন কেনার কথা বলা হয়নি। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে সরবরাহকারী নির্বাচন করা হবে।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৮১১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। বাকি ১ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) ঋণ থেকে জোগান দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের বহরে মোট ২৯২টি লোকোমোটিভ রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৪টি মিটারগেজ এবং ১২৮টি ব্রডগেজ। মেকানিক্যাল কোড-ম্যানুয়েল অনুযায়ী একটি লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ু ২০ বছর। কিন্তু বর্তমানে ব্যবহৃত ১১৫টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের অর্থনৈতিক আয়ু ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
এ ছাড়া ৬২টি মিটারগেজ লোকোমোটিভের বয়স ৪০ বছরের বেশি। এসব পুরোনো ইঞ্জিন এখনও ট্রেন পরিচালনায় ব্যবহৃত হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ লোকোমোটিভের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল হওয়ার পাশাপাশি এগুলোর নির্ভরযোগ্যতাও কম। পুরোনো ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করাও কঠিন ও ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক সময় দীর্ঘদিন সেগুলো অচল পড়ে থাকে।
রেলওয়ে বলছে, নতুন ৩০টি লোকোমোটিভ যুক্ত হলে মিটারগেজ সেকশনে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে। একই সঙ্গে ট্রেন পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি, সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত এবং পুরোনো ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে। নতুন ইঞ্জিনের মাধ্যমে আন্তঃনগর যাত্রী ও দ্রুত বাড়তে থাকা পণ্য পরিবহনের চাহিদাও পূরণ করা যাবে।
রেলওয়ের মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের মিটারগেজ রেললাইনগুলো ডুয়েলগেজে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই কাজ বিলম্বিত হওয়ায় ২০৫৫ থেকে ২০৬০ সাল পর্যন্ত মিটারগেজ ট্রেন পরিচালনা করতে হতে পারে। এ বাস্তবতায় নতুন মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় শুধু ইঞ্জিন কেনাই নয়, প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল ও কনজুমেবল স্পেয়ার্স, টুলস এবং যন্ত্রপাতিও সংগ্রহ করা হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকৌশলী ও সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত জ্ঞান হস্তান্তরের ব্যবস্থা থাকবে। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা স্থানীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনাকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবেন। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে কারিগরি সহায়তাও দেওয়া হবে।
রেলওয়ে মনে করছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মিটারগেজ রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। পাশাপাশি ট্রেন পরিচালনা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কমবে এবং রাজস্ব আয় বাড়বে।
বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রেলপথ দেশের অন্যতম ব্যস্ত মিটারগেজ করিডোর। এই পথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় ডিজেল লোকোমোটিভের প্রাপ্যতা কম থাকায় সেই চাহিদা পূরণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের উপপ্রধান (রেল পরিবহন) মো. নাজমুল হাসান বলেন, ৩০টি মিটারগেজ ডিজেল-ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের পরিবহন সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি পরিবহন সক্ষমতা বাড়বে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. সুবক্তগীন বলেন, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনসেবা বাড়াতেই প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। এআইআইবির ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে এবং অনুমোদনের পর ক্রয়সংক্রান্ত বিষয় চূড়ান্ত করা হবে।
রেলওয়ের মতে, সড়ক পরিবহনের ওপর চাপ কমাতেও নতুন লোকোমোটিভ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়লে সড়ক ও মহাসড়কের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের ব্যয়ও কমতে পারে। পাশাপাশি দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে অধিক সংখ্যক যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হবে।