চিটাগাং টুডে

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের দৃষ্টিতে পবিত্র সফর মাসের তাৎপর্য ও করণীয়

ইসলামী শরিয়ত ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের (সুন্নি আকিদা) নির্ভরযোগ্য আলেমদের মতে, হিজরি বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় মাস ‘সফর’ অন্য সব মাসের মতোই আল্লাহর সৃষ্টি একটি মাস। এই মাসের আলাদা কোনো অশুভ বা অমঙ্গলজনক বৈশিষ্ট্য নেই।সুন্নি মতাদর্শ অনুযায়ী সফর মাসের ফজিলত, গুরুত্ব এবং এই মাসকে কেন্দ্র করে প্রচলিত ভুল ধারণার খণ্ডন নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:১. সফর মাস নিয়ে ইসলাম ও সুন্নি আকিদার মূল ভিত্তিইসলামের আগমনের পূর্বে জাহেলি যুগে আরবরা বিশ্বাস করত যে, সফর মাসটি হলো একটি অভিশপ্ত ও অমঙ্গলের মাস। তারা ভাবত এ মাসে বালা-মুসিবত ও রোগবালাই বেশি নাজিল হয়। তাই তারা এ মাসে বিয়ে-শাদি, ব্যবসা বা নতুন কোনো ভালো কাজ করা থেকে বিরত থাকত।রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জাহেলি যুগের এই কুসংস্কারকে কঠোরভাবে খণ্ডন করেছেন। সহিহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের বিখ্যাত হাদিসে এসেছে, আল্লাহর রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন:"রোগ ব্যাধি নিজে নিজে সংক্রমিত হওয়া এবং অশুভ লক্ষণে বিশ্বাস করা ইসলামে নেই। আর সফর মাসের কোনো অশুভত্ব বা অমঙ্গল নেই।" (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)সুন্নি আকিদা অনুযায়ী, দিন, রাত, মাস বা বছর নিজে থেকে ভালো বা মন্দের মালিক হতে পারে না। লাভ-ক্ষতি, কল্যাণ-অকল্যাণ সবকিছুই একমাত্র মহান আল্লাহর ইচ্ছাধীন। সুতরাং সফর মাসকে অশুভ মনে করা সুন্নি আকিদা বিরোধী।২. সফর মাসের আমল ও ফজিলতসফর মাসের জন্য শরিয়তে নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ ইবাদতের কথা (যেমন নির্দিষ্ট কোনো নামাজ বা রোজা) বলা হয়নি। তবে অন্যান্য সাধারণ মাসের মতো এই মাসেও বেশি বেশি নেক আমল করা ফজিলতপূর্ণ।নফল রোজা: প্রতি সপ্তাহের সোম ও বৃহস্পতিবার এবং হিজরি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ (আইয়ামে বীজ)-এর নফল রোজা রাখা এই মাসেও অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।তওবা ও ইস্তিগফার: যেহেতু জাহেলি যুগে একে বিপদের মাস মনে করা হতো, তাই সুন্নি ওলামায়ে কেরাম বলেন, কোনো বান্দা যদি মনে কোনো ভয় বা শঙ্কা অনুভব করে, তবে তার উচিত বেশি বেশি ইস্তিগফার ও দোয়ায় মগ্ন থাকা।সদকা ও দান-খয়রাত: যেকোনো বালা-মুসিবত থেকে বাঁচার সর্বোত্তম উপায় হলো আল্লাহর রাস্তায় সদকা করা। সফর মাসে বেশি বেশি দান-খয়রাত করলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেকোনো বিপদ-আপদ দূর করে দেন।৩. ‘আখেরী চাহার শোম্বা’ ও সুন্নি দৃষ্টিভঙ্গিসফর মাসের শেষ বুধবারকে মুসলিম বিশ্বে ‘আখেরী চাহার শোম্বা’ বলা হয়। সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে এই দিনটির একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, সফর মাসের এই শেষ বুধবারে রাসূলুল্লাহ (সা.) উনার দীর্ঘ অসুস্থতা থেকে সাময়িক সুস্থতা লাভ করেছিলেন এবং গোসল করে মসজিদে নববীতে এসে নামাজে ইমামতি করেছিলেন। এই খুশিতে সাহাবায়ে কেরাম সাধ্যমতো দান-সদকা করেছিলেন। এই দিনটিকে স্মরণ করে সুন্নি মুসলমানরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন, মিলাদ-কিয়াম, দুরুদ শরীফ পাঠ এবং নফল ইবাদতের আয়োজন করে থাকেন।সফর মাস নিয়ে বর্জনীয় কিছু কুসংস্কার (যা সুন্নি মতে নিষিদ্ধ):১. সফর মাসকে ‘অশুভ’ বা ‘খালি মাস’ মনে করে এই মাসে বিয়ে-শাদি, নতুন ব্যবসা শুরু বা গৃহনির্মাণ থেকে বিরত থাকা যাবে না। ২. এই মাসের প্রথম তেরো দিনকে অনেকে বেশি বিপদসংকুল মনে করেন, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ৩. সফর মাসের বিদায়লগ্নে আনন্দ মিছিল বা বিশেষ কোনো মনগড়া প্রথা পালন করা শরিয়তসম্মত নয়।সংক্ষেপে: সুন্নিদের মতে, সফর মাস হলো ঈমান ও বিশ্বাসের পরীক্ষা দেওয়ার মাস। কুসংস্কারের অন্ধকারে না ডুবে, সব ধরনের কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক একমাত্র আল্লাহকে বিশ্বাস করে এই মাসে বেশি বেশি ইবাদত, জিকির ও সদকা করাই হলো একজন মুমিনের দায়িত্ব।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের দৃষ্টিতে পবিত্র সফর মাসের তাৎপর্য ও করণীয়