ইসলাম ধর্মের আধ্যাত্মিক জগতে এবং সুফি সাধকদের ইতিহাসে পীরানে পীর, গাউসুল আজম দস্তগীর হযরত মাওলানা সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) এক অবিস্মরণীয় ও প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল কাদেরিয়া তরিকাব সুফি ধারার প্রতিষ্ঠাতা নন, বরং ইলমে শরিয়ত ও মা'রিফতের এক অনন্য সমুদ্র, যার জীবন ও কর্ম যুগ যুগ ধরে মানবজাতিকে সত্য, সুন্দর ও খোদাভীরুতার পথ দেখিয়ে আসছে।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) হিজরি ৪৭১ সনের (মতান্তরে অন্য সনেও) ১ রমজান পারস্যের (বর্তমান ইরান) ঐতিহাসিক জিলান অঞ্চলের ‘নয়েফ’ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
শৈশব ও বাল্যকাল: সত্যবাদিতার অনন্য দীক্ষা
বাল্যকাল থেকেই হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) অসাধারণ খোদাভীতি, সততা ও প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন। উনার জীবনে সত্যবাদিতা নিয়ে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে যা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে:
একবার তিনি বাল্যকালে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে বাগদাদ নগরীতে যাওয়ার মনস্থ করেন। যাত্রা করার পূর্বে উনার সৎস্বভাব ও সততার কথা মাথায় রেখে মা উম্মুল খায়ের ফাতেমা (রহঃ) উনার জামার ভেতরে ৪০টি দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) সেলাই করে দেন এবং সবসময় সত্য কথা বলার উপদেশ দেন। পথিমধ্যে একদল ডাকাত উনাদের কাফেলা আক্রমণ করে এবং সবকিছু লুট করে নেয়। এক ডাকাত বালক আব্দুল কাদেরের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, "তোমার কাছে কিছু আছে কি?" বালক আব্দুল কাদের নির্ভয়ে উত্তর দেন, "আমার কাছে ৪০টি দিনার আছে।" ডাকাত সর্দার অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, "তুমি চাইলে তো বিষয়টি গোপন করতে পারতে, কেন সত্য বললে?" আব্দুল কাদের (রহঃ) জবাব দেন, "আমার মা আমাকে সবসময় সত্য কথা বলতে শিখিয়েছেন এবং আমি মায়ের সাথে মিথ্যা বলার ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারি না।" এই মহান সত্যবাদিতা ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব ডাকাত সর্দারের হৃদয়ে এমনভাবে নাড়া দেয় যে, সে তওবা করে সমস্ত ডাকাত দলসহ অপরাধের পথ ছেড়ে সৎপথে ফিরে আসে।
বাগদাদ গমন ও উচ্চশিক্ষা অর্জন
জ্ঞানার্জনের প্রধান কেন্দ্র বাগদাদ নগরীতে ১৮ বছর বয়সে পদার্পণ করেন হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)। সেখানে তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিসদের নিকট থেকে কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেন।
প্রচার, ওয়াজ ও মানবসেবা
দীর্ঘ সাধনা ও কঠোর রিয়াজতের পর তিনি বাগদাদ নগরীতে শিক্ষকতা ও ওয়াজ-নসিহত শুরু করেন। উনার বয়ান শোনার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হতো।
কারামাত ও আধ্যাত্মিক মরতবা
আল্লাহ তাআলা উনাকে বহু অলৌকিক ক্ষমতা বা কারামত দান করেছিলেন। তবে তিনি সবসময় শরিয়তের বিধিবিধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন।
ইন্তেকাল ও মাজার শরিফ
দীর্ঘ জীবন ইসলামের সেবা, দ্বীনের প্রচার এবং মানবকল্যাণে উৎসর্গ করার পর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) ৫৬১ হিজরির ১১ রবিউস সানি ইন্তেকাল করেন।
ইরাকের বাগদাদ নগরীতে অবস্থিত উনার মাজার শরিফ (দরবার শরিফ) বিশ্বজুড়ে আধ্যাত্মিক শান্তি ও জিয়ারতের এক প্রধান কেন্দ্র। প্রতি বছর রবিউস সানি মাসে উনার স্মরণে বিশ্বজুড়ে ‘ফাতেহা-ই ইয়াজদাহম’ পালিত হয় এবং ভক্তরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে উনার শিক্ষা স্মরণ করেন।
উপসংহার
হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর জীবন আমাদের জন্য সততা, খোদাভীতি, ধৈর্য, জ্ঞানসাধনা এবং মানবপ্রেমের এক অনন্য বাতিঘর। বর্তমান অশান্ত ও জটিল বিশ্বে উনার আদর্শ ও শিক্ষা অনুসরণ করার মাধ্যমে সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা এবং নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই মহান অলির উসিলায় সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম ধর্মের আধ্যাত্মিক জগতে এবং সুফি সাধকদের ইতিহাসে পীরানে পীর, গাউসুল আজম দস্তগীর হযরত মাওলানা সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) এক অবিস্মরণীয় ও প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি কেবল কাদেরিয়া তরিকাব সুফি ধারার প্রতিষ্ঠাতা নন, বরং ইলমে শরিয়ত ও মা'রিফতের এক অনন্য সমুদ্র, যার জীবন ও কর্ম যুগ যুগ ধরে মানবজাতিকে সত্য, সুন্দর ও খোদাভীরুতার পথ দেখিয়ে আসছে।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) হিজরি ৪৭১ সনের (মতান্তরে অন্য সনেও) ১ রমজান পারস্যের (বর্তমান ইরান) ঐতিহাসিক জিলান অঞ্চলের ‘নয়েফ’ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
শৈশব ও বাল্যকাল: সত্যবাদিতার অনন্য দীক্ষা
বাল্যকাল থেকেই হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) অসাধারণ খোদাভীতি, সততা ও প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন। উনার জীবনে সত্যবাদিতা নিয়ে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা রয়েছে যা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে:
একবার তিনি বাল্যকালে জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে বাগদাদ নগরীতে যাওয়ার মনস্থ করেন। যাত্রা করার পূর্বে উনার সৎস্বভাব ও সততার কথা মাথায় রেখে মা উম্মুল খায়ের ফাতেমা (রহঃ) উনার জামার ভেতরে ৪০টি দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) সেলাই করে দেন এবং সবসময় সত্য কথা বলার উপদেশ দেন। পথিমধ্যে একদল ডাকাত উনাদের কাফেলা আক্রমণ করে এবং সবকিছু লুট করে নেয়। এক ডাকাত বালক আব্দুল কাদেরের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, "তোমার কাছে কিছু আছে কি?" বালক আব্দুল কাদের নির্ভয়ে উত্তর দেন, "আমার কাছে ৪০টি দিনার আছে।" ডাকাত সর্দার অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, "তুমি চাইলে তো বিষয়টি গোপন করতে পারতে, কেন সত্য বললে?" আব্দুল কাদের (রহঃ) জবাব দেন, "আমার মা আমাকে সবসময় সত্য কথা বলতে শিখিয়েছেন এবং আমি মায়ের সাথে মিথ্যা বলার ওয়াদা ভঙ্গ করতে পারি না।" এই মহান সত্যবাদিতা ও ব্যক্তিত্বের প্রভাব ডাকাত সর্দারের হৃদয়ে এমনভাবে নাড়া দেয় যে, সে তওবা করে সমস্ত ডাকাত দলসহ অপরাধের পথ ছেড়ে সৎপথে ফিরে আসে।
বাগদাদ গমন ও উচ্চশিক্ষা অর্জন
জ্ঞানার্জনের প্রধান কেন্দ্র বাগদাদ নগরীতে ১৮ বছর বয়সে পদার্পণ করেন হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)। সেখানে তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিসদের নিকট থেকে কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেন।
প্রচার, ওয়াজ ও মানবসেবা
দীর্ঘ সাধনা ও কঠোর রিয়াজতের পর তিনি বাগদাদ নগরীতে শিক্ষকতা ও ওয়াজ-নসিহত শুরু করেন। উনার বয়ান শোনার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হতো।
কারামাত ও আধ্যাত্মিক মরতবা
আল্লাহ তাআলা উনাকে বহু অলৌকিক ক্ষমতা বা কারামত দান করেছিলেন। তবে তিনি সবসময় শরিয়তের বিধিবিধানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন।
ইন্তেকাল ও মাজার শরিফ
দীর্ঘ জীবন ইসলামের সেবা, দ্বীনের প্রচার এবং মানবকল্যাণে উৎসর্গ করার পর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) ৫৬১ হিজরির ১১ রবিউস সানি ইন্তেকাল করেন।
ইরাকের বাগদাদ নগরীতে অবস্থিত উনার মাজার শরিফ (দরবার শরিফ) বিশ্বজুড়ে আধ্যাত্মিক শান্তি ও জিয়ারতের এক প্রধান কেন্দ্র। প্রতি বছর রবিউস সানি মাসে উনার স্মরণে বিশ্বজুড়ে ‘ফাতেহা-ই ইয়াজদাহম’ পালিত হয় এবং ভক্তরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে উনার শিক্ষা স্মরণ করেন।
উপসংহার
হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ)-এর জীবন আমাদের জন্য সততা, খোদাভীতি, ধৈর্য, জ্ঞানসাধনা এবং মানবপ্রেমের এক অনন্য বাতিঘর। বর্তমান অশান্ত ও জটিল বিশ্বে উনার আদর্শ ও শিক্ষা অনুসরণ করার মাধ্যমে সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা এবং নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই মহান অলির উসিলায় সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপনার মতামত লিখুন